Wednesday, 5 December 2018

।। সঙ্ঘমিত্রা হালদারের তিনটি কবিতা ।।



(একটি অনুরোধ, পঙ্‌ক্তিগুলো ভেঙে যাচ্ছে মনে হলে আপনার স্মার্টফোনটি আড়াআড়ি করে পড়বেন। ল্যাপে বা ডেস্কটপে এই অসুবিধা হবে না। কবিতাগুলো কেমন লাগল? মতামত দেবেন, এইটুকু চাইছি।) 


খ্রিষ্টপূর্বের

চেরাপাতার গাছ তোমাকে খ্রিষ্টপূর্বের মনে হয়
তোমার মেঠোবাড়িটি কোনও এক সূর্যাস্তের ভেতর হারিয়ে গেছে
নাজারেথের যিশুর তখনও থুতনিতে রেখা আসেনি
শত্রুপক্ষ তখনও বদমেজাজি, সরল
পানীয়ে বিষ মিশিয়ে দেওয়া তখনও কত অকপট
হৃদয়ে তখনও এত পলির ভাঁজ খেলেনি
কোথায় যেতে চেয়ে কোথায় এসে পড়া
তখনও কিছু বিরল নয়

এই এক সন্ধের মুখে মনের আজ এতরকম হচ্ছে
সবাইকে সন্দেহ হচ্ছে অল্পবিস্তর


বাতাসে কর্পূর ভেবে

তুমি কীভাবে দেখো কীভাবে দৃশ্যের গায়ে বুলিয়ে দাও হাত
আমি অনেক দূরের পথে এসে ভুলেছি সেসব
আমাদের যোগাযোগের ভিতর ফিঙে উড়ে গেছে
যতদূর গেলে মুছে যায় অ্যান্টেনা, অভাবে তার  
ডাকাডাকির স্মৃতি এখন অথৈ জলে মানিয়েছে হেসেখেলে
খেয়াল করিনি কখন থেমেছে সব খোঁড়াখুঁড়ি   

চারদিক তার বুকের মতো রোমশ 
তার ঘ্রাণ শুধু উবে গেছে বাতাসে কর্পূর ভেবে 
মিলিয়ে গেছ একা অর্থহীন কী এক রোষে
যে শব্দে ধরা যেত আমাদের তার আঁচড় আমি খুইয়ে ফেলেছি

তোমাকে ভোলার ভেতর আর কোনও পেরেক নেই
অসাবধানে সেই পেরেক শুধু জেগে যায়, একা



যে ঘৃণা নিয়ে
যে ঘৃণা নিয়ে তাকিয়েছ
কী ঘৃণা নিয়ে যে তাকিয়েছ
অথচ খোঁড়া গর্তের দিকে তাকালে দেখতে
জল তারও ছিল বুকের কোনে, চোখের আলে
এক ভাষা ব্যবহারের অল্পতা তাকে নিয়ে যাচ্ছে 
মরণোত্তর খাদের দিকে
তাকে একপ্রকার না দেখেই চলে যাচ্ছে সবার

কেচেধুয়ে রাখা জামা এমনকি তাকে সন্দেহ করছে
তার মালিকানা বিষয়ে কিছু বলার থাকতে পারে কিনা 
ঘৃণার কাঁকর তার চোখ ধুইয়ে দিচ্ছে 
দুনিয়ার আপনজন বলতে এই এক ত্রাস খেলছে তাকে


[কবিতা আশ্রম (মুদ্রিত)-এর আগস্ট ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত] 


শিল্পী: চন্দন মিশ্র 


।। দীর্ঘ কবিতা: বঙ্কিম লেট ।।



( একটি অনুরোধ, পঙ্‌ক্তিগুলো ভেঙে যাচ্ছে মনে হলে আপনার স্মার্টফোনটি আড়াআড়ি করে পড়বেন। ল্যাপে বা ডেস্কটপে এই অসুবিধা হবে না। কবিতাগুলো কেমন লাগল? মতামত দেবেন, এইটুকু চাইছি।) 
                          
 
শিল্পী: চন্দন মিশ্র 



চক্রবাক ও পরিনির্বাণকথা

বঙ্কিম লেট


আর ঘুম আসে না আমার বাড়ি ঘুমের পরি
উড়ে গেছে। আমি তাকে অরণ্যে অরণ্যে খুঁজে ফিরি

বিছানায় ঝরে উল্কা পুড়ছে রজনীগন্ধার খেত
আমি ক্রীতদাস; পিঠ ভেঙে দিচ্ছে জলতৃণের বেত

একদিন আসত ঘুম দিনের শেষ পাতাটি ঝরলে,
মাঠ থেকে সব পাখি গাছের শাখায় ফিরে এলে

হাতে সন্ধ্যামণি ফুল, বলাকার পালক খোঁপায়
কোনও দাওয়াত ছিল না ভাতের গহনে ছিল না
হরিণের নাভিবিভা ঝরত নিরন্ন শালপাতায়

মানুষ ঘুমিয়ে গেলে, রাত সপ্তপর্ণ কথা বলে;
শিশিরের শব্দ ওড়ে ঘাসে, বৃষ্টি-থামা আস্তাবলে 

আমিও টের পেতাম ঘুম পা ফেলছে শুকনো পাতায়,
বাজত পাতার নূপুর প্রাণে, ত্রিপত্র কপাটিকায়

জানালায়, ঝরোকায় সে দিত সেরেনাদের শিস
ঠোঁটের বাতাসে ঢুলত মঞ্জরিত আমলকীর শিষ 

আমার কুটির ছিল বসত বিচ্ছিন্ন। পলাশের
মীনপুচ্ছ ছায়ায়। দূর-আত্মীয় আমি কোনও গ্রহের

রাঙামাটির দেয়াল। খড়ের ছাউনি । ভাঙা দরজা
বিকল ছিল রেডিও, ছিল ঘুণপোকাদের তর্জা

পড়শির পুকুর ছিল। হ্রেষা ছিল ডানাঅলা ঘোড়ার
মাছ ছিল সৌপ্তিকপর্ব রাতের পর রাত শোনার

চাঁদ বসত ডুমুর গাছে, পিঁপড়ে-খাওয়া বাতাসার মতো
স্তব ছিল বল্মীকের। বিভাবরী লণ্ঠনেই পুড়ত

সে আসত, অভিসারিকা ঘাসে ওর পায়ের আগুন
মৃদু চন্দ্রশিখা ওর আঙুল, ভাঙাচোরা সেগুন

কাঠের রাঙা দরজায় টোকা মারত ঝুন ঠুন, ঝুন
চাঁদের পেখম-পারা ওর দেবী ব্র্যান্ডের গাউন




কনকচাঁপার সুগন্ধ মেখে বাতাসে উড়ত ঝলমল
ঠোঁট থেকে খসে পড়ত গোলাপের ফিসফিস পাপড়ি
স্থির গাছ জানালায়; স্নায়ুর শাখাগুলো চঞ্চল

 স্পন্দিত পুষ্প আমার আকাঙ্ক্ষা পেন্ডুলামের ন্যায়
দুলত ওর কানের ফর্সা ঝুমকোলতায়, জোছনায়

বিপন্ন মরালী যথা ডাকত চাপাস্বরে : রাজপুত্তুর,
বাড়ি আছো? রা-জ-পু-ত্তুর? এসেছি আমি। সাড়া দাও, শূর

সাড়া দিতাম না আমি। কাচের কুসুম ভাঙত প্রাণ;
পঞ্চপ্রদীপে ঠেকিয়ে রেখেছিলাম ওর পাঁচটি বাণ

যেমন বইয়ের ভাঁজে গুছিয়ে রেখেছি বন্ধুর
দেওয়া ময়ূরপালকসেই পালকস্মৃতিময়ূর

নিঝুম কোনও বর্ষায় তুমুল নাচবে চৌরাস্তায়
বিকচ কবরী খুলে , মেহগনির জানালায়

হঠাৎ পাওয়া ফাঁকা ঘরে তার চিবুকের নীলা
সপ্তরতি ঘাম দিয়ে গেঁথে রেখেছি জপের মালা

কোনোদিন অনির্বাণ দীপ ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে ফেলে
চোখে রাখবো মুগ্ধ চোখ, ক্ষুধাতৃষ্ণাদি সমস্ত ভুলে


তাকে ডাকব: বিভাবরী, এসেছ? টকটকে ছোঁয়া দাও
ভিতর থেকে দরজা খোলা এসো, রাধাচূড়া ফোটাও,

কিন্তু সেদিন লন্ঠন নেভাতে পারিনি চন্দ্রমৌলী
বিভাবরী অজন্তার উর্বশীর মতো এসেছে কাছে
কবরী থেকে খসাতে পারিনি আফিমের ফুলগুলি

নির্বাসিত সব্যসাচী দণ্ড অরণ্যে অজ্ঞাতবাস
তিরের ফলায় লেগে আছে ঘুরন্ত মাছের বাস

সে ছিল যত সুন্দরী তত ইস্পাতের তরবারি
কীভাবে সাড়া দিতাম: অন্নপাত্রে মীন শিকারী?

তখনও রাজা অশোক দয়ানদীর রক্তিম জলে
আবক্ষ স্নানের পর, শিরস্ত্রাণ, অসি ছুঁড়ে ফেলে

নৈশ আহারে বসেননি। ছ’টি যবের রুটি পদ্মের
পাতায়। মৃৎপাত্রে সুরা। উষ্ণ মাংস বন ময়ুরের

কোনও এক বসন্তের তিমিরে চাঁদের ধুধু রোদে
লিখে ফেলেননি চোদ্দটি কাব্য লিপি পুড়ে যাচ্ছে রোদে 

কলিঙ্গের জলপথ জিতে নিলে আড়াই লক্ষ
সাধের বদলে অন্নবস্ত্র তাৎপর্য আমার লক্ষ্য

কেরোসিনের আলোয় খুঁজছি শার্দূল, অশোকস্তম্ভ
গড়বার জন্যেবাঘের পিঠে সওয়ার সেই সংকল্প

তখনও আনারকলি জ্যান্ত কবরে খুঁড়ছে সুড়ঙ্গ
শ্বাস ও স্বস্তির জন্যে, নীলিমা খোঁজে খাঁচা-বিহঙ্গ

তখনও নাদীর শাহ্‌ লণ্ডভণ্ড করছে রাজধানী
চোখ থেকে কাঁটাচামচে তুলে নিচ্ছে কোহিনূর মণি
সীতার এক—আমাদের শত পরীক্ষা রাতজাগানি

সে এসেছে, কড়া নাড়ে পর্ণকুটিরের দ্বারে দ্বারে;
উপোসী ঠোঁট কীভাবে ওর ঠোঁট রাঙাতে পারে?

তখন আমি রূপনাশা চাষি আলুর জমিতে একা
প্রখর রোদে তাড়াচ্ছি, ঝেড়ে ফেলছি ফাইটফথোরা পোকা

তোমার সুগন্ধি শ্বাস নয়—ঝঞ্ঝার নিয়তবায়ু,
বাসি, বা না বাসি ভালো তবু বালিঝড় শ্বাসবায়ু

বাকলে লুকিয়ে রাখছি গ্লুকোজ ও রাতের নীহার
বিরামে মেপো, সজনি, আমার তুমুল বিএমআর

তুমি ঠোঁট দিতে পারো দিতে পারো উষ্ণ আলিঙ্গন;
 হে সাংখ্যমনীষা, দিতে পারোবনের বিয়ের পণ ?

কাবলি ছোলার পাশে তৃপ্তি আর টাটকা ফুলকো লুচি ?
বিনা ভোজনে জন্মায় কৃষ্ণগহ্বরের অরুচি?

তখনও সুশ্রুতের মতো বেনারসের ঘাটে শরীর
খুঁটে দেখছি কোনখানে নিহিত এই মহাজীবন;
কী চাই প্রাণ—বৈভব না ভিক্ষাপাত্র শাক্যমুনির

জানুয়ারির আদিম রাতে বল্লরিচঞ্চুকপোত-
ওড়া গ্রিটিংস কার্ডও ভেঙে দেয় তাসের জগত

স্থিতি আর গতি জাড্যে মধ্যবর্তী চ্যাপ্টা স্যান্ডুইচ
রোমকূপে ভেসে যায় জুঁইকুড়ি আর মনসিজ

পায়ের তলায় তপ্ত বালি হাতে নিঝুম লণ্ঠন
ময়ূর খুঁজি খেজুর ছায়ায় পূর্ণ প্রতিফলন

ব্যাকুল চপ্পলের ধ্বনি তবুও অপর রিসিভারে
দূর থেকে ভেসে আসত বিরহোৎকণ্ঠিত কর্ণকুহরে

ঠেলে ফেলে এসেছে মধ্যাহ্নের অসমাপ্ত গ্রাস
টেলিফোন বুথের ভিতর গলে যাচ্ছেন পিথাগোরাস
বরফের বহু নীচে আমাকেও দিয়েছি কবর
বার বার টেলিফোন ঘুরে গেছে, সে পায়নি খবর

সেদিন দরজার বাইরে ঘুরছিল উৎকণ্ঠিত নিক্কণ
সেদিন কনকচাঁপার যজ্ঞোত্থিত নম্র হুতাশন

সেদিন বোকাচিত্ত’র স্বর্ণচাঁপা ছিল আবরিত  
নক্ষত্র-ফোটা কলাপে খুঁটছিল ঘাস ইতস্তত

যেন তূণের ভিতর উপচে পড়া চিকন ব্রহ্মাস্ত্র  
যার সামনে নতজানু হওয়া ছাড়া পাল্টা মার নেই
হে পূর্ণ বিকচ অতসী, আজ যাও হে নারায়ণী অস্ত্র,

আজ সাড়ে তিন হাত মাটির ’পর দাঁড়িয়ে থাকা
এসো যেদিন পায়ের তলায় থাকবে আস্ত বসুধা

নিক্কণ থেমে গেছে শেষরাত্রি কেতকী ঝরায়
প্লুতস্বর স্বপ্নভাঙা ভোরের রাজহংসীর গলায়

একটি গুমোট মেঘ, বুক কুচিকুচি করা স্তব্ধতা
উঠোনে কাচের চাঁদ-প্লেট ঝন ঝন করে ভাঙে

সে চলে গেছে

তরঙ্গ ঝরে কুয়াশা মাখা সায়রে
আমার মৌন মুখর কথারা দিগন্তে সারে সারে

ওড়ে। ডুমুর গাছের মাথা থেকে ঝরে গেছে চাঁদ
ঝরা পাতায় ছড়িয়ে শিশিরের চাপা আর্তনাদ

ক্লান্ত ভোর, ক্লান্ত চোখ। চোখের মতো লাল ঊষাকাল
তোমার ফেলে যাওয়া ঘাসে

শুরু হয় সোনালি সকাল

এ-জীবন হেসে ওঠে বনটিয়ার রঙিন ঠোঁটে
চন্দন কাঠের বাংলো। সুখের ডালিয়াক্ষেত ফোটে

মেহগিনির টেবিল চা’য়ে ডোবাই সোনার বিস্কুট
ওয়ার্ডরোব  ভরে গেছে আরামে আছে শাড়ি ও স্যুট

রুপোয় মাজা দেওয়াল ঘাসে আবৃত লন, সুইমিং
পুল। পর্টিকোয় ঠেকা চেরি-লাল ক্ষিপ্র মার্সিডিজ
শার্সিতে শার্সিতে আঁকা খাজুরাহর গ্লাস পেন্টিং

দুপুরে সর্ষে ইলিশ, রাতে গলদা চিংড়ির কারি
শপিং মল, রেস্তোরাঁ, পাইন অরণ্যের পানশালা
কব্জিতে জড়িয়ে রাখি চুনিপান্নার স্লিম মালা
রুদ্ধশ্বাস সুখ পণ্যতরীতে তারার ফুলঝুরি

ভিআইপি বক্সে নাচি, মহাশূন্যে ছায়াপুঞ্জ জ্বলে,
তবুও কই মাছের ফুলকা আটকে আছে ঘুনজালে

সুখ ডালিয়ার মতো ঝরেঝাঁক টিয়া উড়ে যায়
সন্ধ্যে হওয়ার আগে নীল নদীর খাঁখাঁ কিনারায়

শস্যমুখর পড়ে থাকে বটের একলাটিয়া বন
তোমার জন্যে স্বপ্নপরি  হঠাৎ ডুকরে ওঠে মন

তুমি শুধু ঘুম নও আত্মমন্থনোত্থিতা কবিতা
বস্তুপুঞ্জের নিচোল নিবৃত পদ্মনাভি, অমৃতা

তোমার স্বপ্নগুলো রোজ রাতে আমায় খুঁজতে আসে
আমি শুধু সরে গেছি নির্বাণী  ঘাসের থেকে ঘাসে

কত দিন ঘুমোওনি ঘুম, জেগেছ ঝুলন্ত বারান্দায়!
মাড়িয়ে চলি সন্মার্গ, ছেয়ে আছে উল্কার কাঁটায়

তোমার কাছেই ফিরে এলাম, হে আজন্ম বঞ্চিতা 
অন্ধকার পায়ে পায়ে আজ তোমাকে খুঁজছি, কবিতা  

কোথা ছিল যেন ওর বাড়ি ? ছিল শ্যামল উপত্যকা
বন ছিল সূর্যমুখীর মেহগনির কুটির ছিল
ছিল চন্দ্রমল্লিকার খেত। কুয়ো ছিল চাঁদ–ছাঁকা
মাছরাঙার পালকনিভ দু’বাহু ঝরোকায় ছিল রাখা

মাড়িয়ে চলেছি পথ শরবিদ্ধ চক্রবাক পাখি
আবছা মেহগিনির কুঠি বহুদূরে অনির্বাণ বাতি
তুমি কি আজও দাঁড়িয়ে আছো, শ্রেয়সী, উজ্জ্বল জ্যোতি?

কালঘাম ঝরে গলা শুকায় হাপায় লক্ষ্মী পেঁচা
বহু খনি খুঁড়ে এসেছি স্বর্ণশ্রমিক। হয়নি বাঁচা

বুক ধক ধক করেএক হাত দূরে বন্ধ দুয়ার
কক্ষ কক্ষান্তরে স্বর্ণ চাঁপার আভা, কোমল গান্ধার

ময়ূরীর পালক ঝরে আছে ঘাসে–বিষাদ যথা
দেখা দাও, পদ্মপাণি, সমস্ত দুঃখের উপকথা

জলের সমান বলি খোলো দ্বার সখি, খোলো দ্বার
হাতে দাও শূন্য হাত, সরাও শরের অন্ধকার

রাজকুমারী, বাড়ি আছ? কড়া নাড়ি বন্ধ দরজায়
আমার সকল বিত্ত নিয়ে ফকির করো আমায়
সাড়া নেই

স্তব্ধ কুঠি 
পাখি ডাকে আমার আর্তনাদ
বাঁশের চাঁই-এ বসি ঝরাপাতা পোড়ে মায়াজলে

মেহগনির মাথা থেকে পাতকুয়োর নিথর ঝিলে 
ঝাঁপ দিয়ে ভাসতে থাকে,

মুছে যায় একলাটিয়া চাঁদ

[কবিতা আশ্রম (মুদ্রিত)-এর আগস্ট ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত] 

।। কবিতা: অর্পিতা কুন্ডু ।।



অর্পিতা কুন্ডু
নেই
ছড়ানো মেঘের কাছে পা’দুটি ছড়িয়ে বসে আছ
ডাকি যে, এমন ডানা নেই
পাশে বসি, নেই এমন কপোল ভেজানো জলধারা
সারা পাড়া বুঁদ হয়ে আছে, নিরালায়
সেলাই মেশিন থেকে টুপটুপ হাওয়া ঝরে
তুলে নিয়ে যায় কার চিঠি...

ডাকি যে, এমন গান নেই
নৌকোর গলুইয়ে নেই হৃদয়-চোঁয়ানো, লাল বিরহপতাকা

শুধু দূর থেকে চেয়ে দেখি, চলে যাচ্ছ

আমার হাতের খুঁটে দশ বছরের বাঁধা হাত

ডাকি যে, এমন কোন জীবন দাঁড়িয়ে নেই
                       এ জীবনে আর...



( একটি অনুরোধ, পঙ্‌ক্তিগুলো ভেঙে যাচ্ছে মনে হলে আপনার স্মার্টফোনটি আড়াআড়ি করে পড়বেন। ল্যাপে বা ডেস্কটপে এই অসুবিধা হবে না। কবিতাগুলো কেমন লাগল? মতামত দেবেন, এইটুকু চাইছি।) 

শিল্পী: মণিশঙ্কর 


।। জয়দেব বাউরীর চারটি কবিতা ।।



( একটি অনুরোধ, পঙ্‌ক্তিগুলো ভেঙে যাচ্ছে মনে হলে আপনার স্মার্টফোনটি আড়াআড়ি করে পড়বেন। ল্যাপে বা ডেস্কটপে এই অসুবিধা হবে না। কবিতাগুলো কেমন লাগল? মতামত দেবেন, এইটুকু চাইছি।) 

কাব্যভাষা

ছেড়ে যাব এই প্রেম, এই কাব্যভাষা-মধুমাস
কোথাও অশান্তি নেই, নেই কোনো ভুল বোঝাবুঝি
অভ্যস্ত রতির গায়ে লেগে আছে পূর্ণিমার চাঁদ
ভেতরে কিসের ডাক? পথ ভেঙে পথ খোঁজাখুঁজি

যে আলোই এসে বসে, ম্রিয়মাণ হয়ে থাকে ঘর
তির্যক হলুদ রূপ, কবেকার শব্দমাত্রাবোধ
জড়ানো বুকের ফাঁকে ছায়া পড়ে অন্ধকার জমে
ঢোকে না তেমন আলো, কোনো ঋতু, সকালের রোদ

শ্রদ্ধাবোধ ছলোছলো, রয়েগেছে পিছুটানপথ
অনিবার্য বাঁক এসে দাঁড়িয়েছে দু-পায়ের কাছে
নতুন কালির দাগ প্রথা ভেঙে উদ্ভাসন চায়
মুগ্ধতা ও ম্লান মুখে প্রশ্নহীন খানিক তফাতে

বৈশাখ ঢুকুক বুকে, দিকচিহ্ন স্পষ্ট হোক আরো
এক মায়া পড়ে আছে; এক মায়া ডাকছে আবারো




প্রবণতা

কার কাছে রাখা আছে বিনম্র প্রেমের ভাষা, গান?
শুধুই সহজ আলো লালন করেছে নাকি কেউ!
কোনো অন্ধকার নেই আশেপাশে, তাকেও জড়িয়ে?

প্রতাপে সংশয় এলে হিংস্র করে তোলে তোমাকেও!

অস্তিত্ব, প্রসার চায় ভালোবাসা অথবা আঘাতে
প্রতিটি স্বত্তার ঘুমে শ্রেষ্ঠত্বের প্রবণতা আছে
কল্যাণ যতটা যায় অকল্যাণ যায় তার পাশে!

যেকোনো ধম্মের রোগ, জ্ঞানেরও, ভীষণ ছোঁয়াচে

সবই রয়েছে তাই যা-কিছু থাকার কথা আছে
সংযোজন আরো আরো, সংস্করণের প্রতি ধাপে
তবু রক্তকণিকারা উদভ্রান্ত, তীব্র হয়ে ওঠে
আরো এক বোধ দেখি জ্বলে থাকে পূবের আকাশে

ধ্বজার আঁধারে যত সর্বনাশ, যত পিছুটান...
গতির আলোয় বুক ততটাই হবে শুনশান?



বড়ো বেশি কথা হয়

কবিতার আড্ডা চলে, পাক খেতে থাকে কালো ধোঁয়া
খেউড়েরা উড়ে যায় সাঁঝবাতি জ্বলে দূরে-দূরে
ভালোবাসা-দ্বেষ-ক্ষোভ, রাগ-ঘৃণা গেঁজে ওঠে ক্রমে

পাতা পাতা অভিমান ঝরে পড়ে গ্রাম ও শহরে

শেষ ট্রেন চলে গেছে কবে যেন, হুঁশ নেই কারো!
প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা, শুধু ডেকে গেল রাতচরা পাখি
আলোগুলি ম্লানহয়, ইতিউতি নিভে যায় ধীরে

শেষ ট্রেন চলে গেছে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছি...

আমাদের কথা শেষ রাত শুরু করে কথকতা
অনন্ত আকাশ জুড়ে মাখামাখি গান আর আলো
গাছে গাছে রাখা আছে অনাবিল জীবনের স্রোত...
সফলতা ব্ল্যাকহোল, ব্যর্থতাও ততটাই কালো!

ভোরটির গায়ে গায়ে শুকতারা জাগে করুণায়
বড়ো বেশি কথা হয়, ভেতরে কবিতা মরে যায়



সামর্থ্য

যে কোনো অংকের মুখে কত যে চেয়েছি ধুম জ্বর!
সমস্ত গোপন সূত্র,ভেতরের গোয়েন্দানজর
আমাকে বিমূঢ় করে নিদারুণ ব্যর্থ প্রতিবার!
আড়ালের অস্ত্রাগারে ভিজে গেছে সমস্ত বারুদ

আগ্রহ কোথায় থাকে? হৃদয়ের কতটা অতলে?
কোন বোধিমূলে, কোন সূক্ষ্মতম ফুলের ভেতর
আর কোন বনমালী হাত ধরে আলোতে নামায়?
বেলা হলে হেঁটে যায়; ডানা পায় বাতাসের মুখে

সুগন্ধি ফুলের মধু, সবুজের বেদম অভাব
কঠিন অংকের থেকে কতটা বিমুখ করে তোলে?
কেউ চায় ধুম জ্বর, ভাঙাভাঙি, সহজ অসুখ
একা ঘর ডুবুডুবু, হলুদ পাতারা এসে ধরে...

লজ্জা তো হীনের চিন্তা, বহু পরে জয়-পরাজয়
সামর্থ্য বিমুখ হলে কেউ কেউ চায় নিজক্ষয়


(কবিতাগুলো 'কবিতা আশ্রম'-এর ( মুদ্রিত) আগস্ট ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত) 

 
শিল্পী-চন্দন মিশ্র 


।। কবিতা আশ্রম ব্লগজিন ।। তৃতীয় সংখ্যা ।। ডিসেম্বর ২০১৮ ।।

শিল্পী: চন্দন মিশ্র                                                           কথা    ফের নকশিকাঁথার ভাঁজ খুলে মাঠে-মাঠে অঘ...