Monday, 3 December 2018

।। তরুণ কবির আলো-১: চন্দন দাস ।।



চন্দন দাস
চন্দন দাসের জন্ম ১৯৯১ সালে পূর্ব মেদনীপুরের দক্ষিণ হরকুলি গ্রামে। বাংলায় স্নাতক চন্দনের কবিতা লেখা শুরু স্কুলের ম্যাগাজিনে। ইমেল: chandananikpampa@gmail.com


 
চন্দন দাস 


( একটি অনুরোধ, পঙ্‌ক্তিগুলো ভেঙে যাচ্ছে মনে হলে আপনার স্মার্টফোনটি আড়াআড়ি করে পড়বেন। ল্যাপে বা ডেস্কটপে এই অসুবিধা হবে না। কবিতাগুলো কেমন লাগল? মতামত দেবেন, এইটুকু চাইছি।) 



স্বীকারোক্তি 
এখন যেকোনো দুঃসংবাদে মন খারাপ হয় না
নীলচোখে যেদিন সন্ধ্যা নামল সেদিন জেনেছি
আমার মৃত্যু সংবাদে কেঁপে উঠবোনা স্বাভাবিক!

বাবার চশমাটা ঝেড়েদেখি; সান্ধ্যকালীন ছায়াগাছ 
সুতীব্রভাবে রেড সিগন্যালে আটকে গেছে 
মায়ের আঁচলে মাড়-খাওয়া শুক্লপক্ষের তারাগুলো  
অলৌকিক রাতে জন্মদেয় বেওয়ারিশ আগুন

চারিপাশে ভিয়েনা স্লোগান অবিশ্বাস্যভাবে
আমাকে জড়িয়ে ধরে। পুড়েযাই প্রেতাত্মা আগুনে 
বুভুক্ষু শকুনের ঠোঁটে নরম মাংসের গন্ধ ফুলে ওঠে
কতবার চিৎকারে বলেছি বন্ধ হোক, এই নরকযন্ত্রণা!

এখন আর কোনো কিছুতেই আশ্চর্য হইনা তেমন
মায়ের আঁচল দিয়ে যেদিন শুকনো চাঁদ গলে গেছে 
বাবার চশমা থেকে খুলে গেছে মাটির পৃথিবী 
সেইদিন দেখেছি নগ্ন নাবিকের চোখে এক সমুদ্র মদ

বাতাসে রঙিন ফেনা ডুবে যাচ্ছে আমার ভেতর
বেঁচে থাকার গান রিংটোন বাজে পাড়ায় পাড়ায়
আমিও সেইদিন দূরবী ছাড়া শুধু আকাশ দেখেছি 
মাটি আর আকাশের দূরত্ব মাপতে পারিনি।


ফেরিওয়ালা
চোখ বন্ধ করলে নিজেকে দেখতে পাই
আশ্চর্য এক ফেরিওয়ালা।
যতটা কাছে যাওয়ার ছিল
ততটাই বিক্ষিপ্ত
তারপর গিরিখাত
সমস্ত পথ নদী হয়ে যায়।
এত মায়া কোত্থেকে আসে
অনাবাদী জমির পাশ দিয়ে যেতে-যেতে
খুচরো পয়সায় খরচ।
তবুও
শূন্যতার আকাশে স্বপ্ন আঁকি
নীল পালকের উড়ন্ত হাঁস।


না-কবিতার একটি
শেষকথা
দূর থেকে কিছুই বোঝা যায় না
গভীরে রেখেছ ঘাসজন্মের ইতিবৃত্ত
পাথরের ছায়া নিয়ে সরে গেছো তুমুল
জন্মান্ধ প্রেমিক আঁচড়ে বিষফল
পৃথিবীর সমস্ত ইতিহাসে ঘুরে দাঁড়ানো ভাল

শক্ত চোয়ালের নীচে কার ছবি আঁকো?
যে তোমায় দেখিয়েছিল সমুদ্র,
প্রতিবেশী বাতাসে তিমির মাদকতা,
ডানা ছেঁড়া পাখির লাল চোখ।
যে বলেছিল
জীবনের সমার্থক আগুন হতে পারে না!

প্রশ্নচিহ্নের ভেতর প্রান্তিক বৃষ্টি লুকিয়ে
পকেটে রেখেছ জুঁইফুলের রুমাল,
অথচ দ্যাখো চারিপাশে কত মেঘের পাহাড়
বেলাশেষে মুছে দিতে পারতে সবকিছু।

তবে শেষ কথা হোক
সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেছ যে অলৌকিক ঘরে
সিলিংয়ে ঝুলছে দ্যাখো সিকতাসৈকত।




অলংকরণ: মণিশঙ্কর

Wednesday, 31 October 2018

।। কবিতা আশ্রম অনলাইন ।। নভেম্বর সংখ্যা ।। ২০১৮ ।। ( দ্বিতীয় সংখ্যা ) ।।


কথা

আমাদের উঠোন জুড়ে শ্যামাকার্তিক। হৃদয়ে অনন্ত আতসবাজি নিয়ে স্বপ্নগম্বুজে পাগল হওয়া আরও একবার। ভূতচতুর্দশীর নিশিআলোস্নানে আমরা ফের মেতে উঠব বুঝি-বা। ভূত-ই সত্য তবে? কবির নশ্বর দেহ পঞ্চভূতে মিলিয়ে যাবার পর কি অতল থেকে জেগে ওঠে না তাঁর অমৃত কণ্ঠস্বর? ভবিষ্যৎ কি লুকিয়ে নেই সেইসব কণ্ঠে? কবি নিত্য মালাকারও আমাদের ছেড়ে পঞ্চভূতের দেশে বিলীন হয়ে গেলেন, তবু জেগে রইল তাঁর অমৃত কণ্ঠ, “যাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম সে আর যাইহোক আমার অর্জন নয়” (‘বিগ্রহ’/ নিত্য মালাকার’)। ‘অর্জন নয়’ বলেই বোধহয় আমাদের ‘জড়িয়ে’ ধরার মায়া থেকে চলে যেতে হয়। জন্মের বিরুদ্ধে, মৃত্যুর বিরুদ্ধে তাই ক্ষোভ দানা বাঁধে। তাই বুঝি ফের কণ্ঠ বাজে, “ক্ষোভ গভীর হোক, ক্রমশ নির্মিত হোক সেই সে স্ফটিকবিন্দু যাকে তুমি/ কিছুতেই মৃত্যুময় কোনো শব্দে ধরতে চেয়ে মূঢ়তায় রক্তিম হবে না।” ( ‘বিগ্রহ’/ নিত্য মালাকার)। অনন্ত কবিতার কাছে নত হয়ে বলব, হে কবিকণ্ঠ, আমরাও যেন ধীরে-ধীরে নির্মাণ করতে শিখি সেই ‘স্ফটিকবিন্দু’, যাকে ধরতে চাওয়ার মূঢ়তায় যেন কিছুতেই ছুঁয়ে না-ফেলে কোনও মৃত্যুশব্দ।



সূচি


সাক্ষাৎকার: কবিতা আশ্রম-এর নেওয়া নিত্য মালাকারের সাক্ষাৎকার
গদ্য-১: রাখা রয়েছে মেঘ যখন যেমন চাই(প্রসঙ্গ: নিত্য মালাকার):রিমি দে 
 গদ্য-২: চিতাবাঘের ডাকে ঘুম ভেঙে যেত (প্রসঙ্গ: যামিনী রায়): সুদীপ বসু
বই উৎসব: কতবার ভেবেছি পুনর্বার জেগে উঠি: পাঠক সেনগুপ্ত
ছোটগল্প: ঘোড়া: অমিতকুমার বিশ্বাস



কবিতা আশ্রম অনলাইন ( ব্লগজিন )-এর কার্যকরী সম্পাদক: তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়  


শিল্পী:চন্দন মিশ্র 


।। কবিতা আশ্রম-এর শরৎ সংখ্যা ১৪২৩-এ প্রকাশিত নিত্য মালাকারের সাক্ষাৎকার ।।

কবি নিত্য মালাকারের ছবিটি ফেসবুকের সৌজন্যে প্রাপ্ত




।। রাখা হয়েছে মেঘ যখন যেমন চাই ( প্রসঙ্গ: কবি নিত্য মালাকার) ।। রিমি দে ।।

রাখা হয়েছে মেঘ যখন যেমন চাই           
রিমি দে



মনে হয় সত্যমিথ্যের যমজ-জন্মের আগে গান ছিল–––আমার এক প্রিয় কবির (উৎপলকুমার বসু) উচ্চারণের সূত্র ধরে বলি, ওই মনে হওয়া গুনগুন থেকেই তুলে নেওয়া যায় হাসি ও হাহাকার। এমন একটি ফুলের দিনের জন্য কবিতা লেখা, যে-দিনে ফুল ও কবিতা বৃষ্টি হয়ে ঝরতে-ঝরতে বয়ে যায় নিজের ধারায়। সে-ধারাপাতে কবির মোহ মোহন ও অর্জন এমন এক সংকেত বহন করে যেখানে কবি নিঃস্ব হয়ে যেতে চায়, আবার এক আশ্চর্য অপূর্ব যা শুধু বাঁশির নীরব সুরে অন্তরের অন্দরে কানায় কানায় ভরিয়ে দেয়।   
               একজন প্রকৃত কবির ধারা কোন খাতে বইবে তা অজানা। তবে ভিতরঘরের পাগলগুলো যখন আগল খুলে দেয়, তখন কবির রোগ ও রোগমুক্তির কারণ কবিতাকেই নির্দেশ করে। কবি নিরুদ্দেশ হন কবিতায়। এমন এক নিরুদ্দেশের কবি নিত্য মালাকার। ভারত স্বাধীন হবার দু’দিন পরেই ওঁর জন্ম। অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৮-ই আগস্ট। জন্ম হয়েছিল বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে। ১৯৫৬ সাল থেকে নবদ্বীপবাসী। তারপর কোচবিহার জেলার মাথাভাঙ্গায় চাকরিসূত্রে এসে পাকাপাকিভাবে বসবাস শুরু করেন। বাহান্ন বছর ধরে কবিতার সঙ্গে নিত্য মালাকারের ঘর করা। এ-কোনো সহজ কথা নয়। উনিশ-কুড়ি বছর থেকেই কবিতা তাঁর মন চুরি করে। তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় কবিতায় ডুবে থাকা। নবদ্বীপে থাকাকালীনই একটু-একটু করে কবিতার কাছে চলে আসেন নিজেরই অজান্তে। পরিনত বয়সে নদী মানসাইয়ের পাশে বসবাস করতে-করতে ভিতরেও এক মানসাই লালন করতেন। তাইতো নির্জনতাই নিত্য মালাকারের পরমপ্রিয় হয়ে ওঠে।
               নিত্য মালাকারের কবিতা মানেই এক নিভৃত পথিকের নিরুচ্চার কণ্ঠ। স্বগতোক্তির মতো সত্যভাষ। যেন এক অনন্ত ব্রহ্মনাম। সময়কে সঙ্গী করে ভাবে-বৈভবে-দর্শনে চরম বিন্দু ছুঁয়ে থাকার প্রবনতা। লৌকিককে কবিতার অলৌকিকে পৌঁছে দেবার যাদুটোনায় নিত্য মালাকার সিদ্ধহস্ত ছিলেন। বাংলা আকাদেমি থেকে হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও কেন্দ্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। পেয়েছিলেন ‘পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি বিভা চট্টোপাধ্যায় স্মারক সম্মান’। তবু প্রান্তে বসবাস করার জন্য সেই প্রচারের আলো তেমনভাবে ওঁর কবিতায় পড়েনি। প্রকৃত কবি কি আর প্রচার চান? কবি চান নির্ভেজাল কবিতাযাপন। কবি চান সত্যের খুব কাছে থেকে জীবনদর্শন। আর দর্শনের গভীর থেকে উঠে আসবে সেইসব আশ্চর্যময় কুয়াশাঢাকা কবিতা। যে কবিতা স্বল্প ছুঁয়ে ফেললে আরো নিবিড় করে পাবার ইচ্ছে জাগে। অথচ তার রহস্যময়তাকে কখনওই ভেদ করা যায় না। কবি নিত্যর কবিতার কী এক অমোঘ আকর্ষণ যা নিয়ত তাড়া করে নিবিড় পাঠককে! নিত্য মালাকার স্বমহিমায় মফস্বলের ঝিঁঝিডাক আর জলফড়িঙের মধ্য থেকে মুক্তোর যাপনটুকু আলগোছে কুড়িয়ে ভাষার দ্যোতনায় উপলব্ধিকে বেঁধে ফেলেন পঙক্তিতে। অনুভবের গভীরতায় রচিত হয় নিবিড় উচ্চারণ:    
        ইদানিং বৃষ্টির দিনে কিছুটা এগিয়ে হেঁটে পেয়েছি ব্রহ্মস্বাদ
                               এবং প্রতিভাময়ীর ওই অতুল উষ্ণতা
        পেয়েছি পাখির ডাক দোয়েল ও শিমুলের চৈত্র-রটনা
        উত্তরোত্তর পর্যায়ক্রমে দেখেছি বিরহ-খাদ
                                            দেখেছি সমুহ
        এবং তা সতত গোলাপি আর ঘাসের জঙলে উদগ্রীব
        হেসেছি প্রভাত ছুঁয়ে সন্ধ্যা-রাত্রি ছুঁয়ে ওই অভিমুখে
                                    নত, প্রণত হতে-হতে
        কেঁদেছি, বলেছি কথা বিন্দু-বিন্দু থেকে বারিকণা থেকে

                ‘আমাদের ঘোড়া’  কবিতায় তিনি বলেন:

আহ, কী সবুজ-বলে
আর্তনাদ করে উঠল আমাদের ঘোড়া

আহ, কী অগাধ বলে
ভেঙে কুটিপাটি হল আমাদের ঘোড়া

মনে পড়ে, কখনো এমন কথা
তোমাকে বলেছি?

বলেছি, বলেছি

                 বাস্তবের অনুষঙ্গই উঠে আসে কবি নিত্যর নিত্যদিনের কবিতার আনাচকানাচ। অথচ অসাধারণ দক্ষতায় তা আবহমানের ইঙ্গিতের বাহক। ‘মাধব’, ‘যাদব’, ‘গোঁসাই’, ‘ব্রহ্ম’-----এই শব্দগুলি ওঁর কবিতায় ঘুরেফিরে আসে। গৃহী হয়েও এক বাউলমন ওঁকে তাড়িয়ে বেড়াত খুব।  
                হৃদয়ের গহীন থেকে দেখানো এই সহজ জীবনের সহজিয়া রূপের আড়ালে দীক্ষার যে গভীর মর্মার্থ উঁকি দেয় সেখানেই নিত্য মালাকার ওঁর নিজস্ব ভাষাবোধ ও উপলব্ধিতে অনন্য, অগাধ ও চিরকালীন। প্রচুর কবিতার পঙক্তি বুকে ধরে রাখার মতো। কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি! ওঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থগুলি হল ‘অন্ধের বাগান’, ‘সূত্রধরের স্বগতোক্তি’, ‘দানাফসলের দেশে’, ‘গীতবিতানপ্রসূতরাত্রি’, ‘এই বৃষ্টিধারা’, ‘যথার্থ বাক্যটি রচনার স্বার্থে’ ও ‘নিমব্রহ্ম সরস্বতী’। ‘মাথার ভেতরে নক্ষত্রখচিত রাত্রি’ নিয়ে নিত্য মালাকার ছটফট করেন কবিতার জন্য। বলেন:
বুঝি, ভুলিয়ে-ভালিয়ে আনা হয়েছে এখানে
যতই পাথর হোক, অমসৃণ, কঠোর বা নির্জন—
দেখছি অর্কিড-নরম আর নিচে, মহা নিচে স্বচ্ছন্দ জল
 নিজেই নিজের বুক ঢাকছে ফেনায়...

শিল্পী: চন্দন মিশ্র 

।। চিতাবাঘের ডাকে ঘুম ভেঙে যেত ( প্রসঙ্গ: যামিনী রায়) ।। সুদীপ বসু ।।

কবিতা আশ্রম-এর জুলাই সংখ্যা ২০১৮ (মুদ্রিত) থেকে:  


                              চিতাবাঘের ডাকে ঘুম ভেঙে যেত
                                    (প্রসঙ্গ:যামিনী রায়)  
                                                    সুদীপ বসু



কলকাতা: জীমূত চলে গেল...
যামিনী: ওই কথাটা তুলো না...ওর কথা ভাবলে আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসে...আমার মাথার সব কোষগুলোও ঠোকাঠুকি শুরু করে দেয়------
কলকাতা: জীমূতের মৃত্যুর জন্যে তুমি কি কিছুটা নিজেই দায়ী?
যামিনী: জানি না (কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে)...একেবারেই জানি না...দারিদ্র্য ছিল...চরম দারিদ্র্য ছিল তখন...সেই ট্রাঞ্জিসন পিরিয়ডটায়...পোর্ট্রেট ছেড়ে নিজের চিত্রভাষা খুঁজে বেড়াচ্ছি...সংসারের প্রতি চরম অবহেলা করেছি তখন...সেই সময়টায়...ধর্ম, জীমূত ওদের এক জায়গায় মুড়ি কিনে দিতাম সারা দিনের খাবার জন্যে...রবীন্দ্রনাথ সেই সময় বলেছিলেন আমার স্ত্রীকে ‘যামিনী যে পথ নিয়েছে তাতে তো তোমাদের দুজনের একবস্ত্রে থাকার কথা।’ ...সত্যিই সেইরকমই দিন গেছে আমাদের তখন।
কলকাতা: কিন্তু জীমূত তো চলে গেল আরও পরে? তখন তো তুমি অনেকটা দাঁড়িয়ে গেছ তোমার নতুন চিত্ররীতি নিয়ে?
যামিনী: সেটাই আশ্চর্য! ...তখন তো আমাদের দারিদ্র্য একটু-একটু করে সরে যাচ্ছে ...যুদ্ধের জন্যে আসা সৈন্যিকেরা আমার ছবি কিনছে একটু-আধটু...”
                                         ( যামিনী কলকাতা সাক্ষাৎকার: সঞ্জয় ঘোষ )

             বাঁকুড়া জেলা। গ্রাম বেলিয়াতোড়। গ্রামদেশের প্রাচীন অন্ধকার। প্রাগৈতিহাসিক পশুর মতো হিংস্র রহস্যময় আর কালো। রাতে বিছানায় শুয়ে-শুয়ে শিশুটি ফুঁপিয়ে-ফুঁপিয়ে কাঁদে। তাঁর ঘুম আসে না। কষ্টে নয়, আতঙ্কে। আতঙ্কও তো একধরণের শারীরিক কষ্ট। গ্রামের শেষ সীমানায় মাটির বাড়ি। পাশেই বেলিয়াতোড়ের গভীর জঙ্গল। সন্ধের পর অন্ধকার নামলেই সেখান থেকে ভেসে আসে হাতির ডাক, শেয়ালের তীব্র চিৎকার, চিতাবাঘের গর্জন। ভয়ে হাড় হিম হয়ে যায়। বাবা সারারাত গোয়ালে হিংস্র পশুর কবল থেকে গোরু-মোষগুলিকে পাহারা দেন লাঠি হাতে। শিশুটি আধোঘুমে ভয়ে চিৎকার করে উঠলে তিনি দৌড়ে আসেন ঘরে। শিশুটিকে সান্ত্বনা দেন, ‘ভয় নেই, এই দ্যাখো আমার হাতে রামদা, কেউ কাছে এলেই কোপ বসিয়ে দেব।’ তবু তার ভয় যেন আর যায় না।
               যায়ওনি। পরে সে যখন ধীরে-ধীরে বড় হয়েছে, সংসারী হয়েছে, কাজপাগল উন্মাদ শিল্পী হয়েছে, যামিনী রায় হয়েছে, তখনও এই জঙ্গল তাঁর মধ্যে নিরন্তর ছায়া ফেলে গেছে। এই অন্ধকারের আতঙ্ক, জন্তুজানোয়ারের অবসেশান শুধু যে যামিনী রায়ের জীবন আর শিল্পকর্মেই বারবার দেখা দিয়ে গেছে তা নয়, তাহলে তো তাও একরকম স্বাভাবিক ব্যাপারই হত, জীবনের একটা চরম সংকটের সময়ে তা যেন তাঁর নিয়তি হয়ে উঠল। আর জন্ম নিল শিল্পীর জীবনের সবচেয়ে রক্তাক্ত ক্ষতস্থান, জীবনের জমারক্ত।
              অসামান্য পোর্ট্রেট আঁকতেন যামিনী রায়। পোর্ট্রেট এঁকে তখন তাঁর খুব নামডাক। পোর্ট্রেটের বিক্রি আছে দারুণ। তাছাড়া ফরমায়েসী পোর্ট্রেট এঁকে রোজগার আরো ভালো। একজন চিত্রশিল্পীর জীবনে একে প্রাচুর্যই হয়তো বলা যায়।
              কিন্তু একজন জাতশিল্পীর কাছে পোর্ট্রেট এঁকে জীবিকানির্বাহ আর সরকারি করণিকের চাকরি করে রোজগার করা তো হরেদরে একই। এমন আর্থিক স্বচ্ছলতা সাধারণ মানুষকে আত্মতুষ্টি জোগায়, কিন্তু প্রকৃত শিল্পীকে আত্মধিক্কারে আচ্ছন্ন করে। স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও সন্তুষ্টি ছিল না যামিনী রায়ের। নতুন ছবির ভাষায় যে ক্ষুধা তাঁর আজন্মকালের, তা যেন আর প্রবলশক্তিতে আক্রমণ করল তাঁকে, এই সময়ে। তাঁর বাবা সরকারি চাকরির নিশ্চয়তায় ভরা সুখের সময় হঠাৎ খারিজ করে দিয়ে পরিবার নিয়ে বেলিয়াতোড়ের গ্রামে ফিরে গিয়েছিলেন। গিয়ে জীবনকে স্বেচ্ছায় আরো বিপন্ন করে তুলেছিলেন। যামিনী রায়ের শিরায়-শিরায় তো সেই রক্তেরই তোলপাড় ছিল। তিনিও আকস্মিকভাবে পোর্ট্রেটের কাজ ছেড়ে নতুন চিত্রভাষার নতুন ডিকশনের সন্ধানে নেমে পড়লেন, ফলে অচিরেই চরম দারিদ্র্যের ভেতর ডুবে গেল তাঁর সংসারঅর্থ নেই, অন্ন নেই, বাড়িভাড়ার সংকুলান নেই। বাড়িওয়ালার চাপে এক উত্তর কলকাতার অঞ্চলেই বাড়ি বদলাতে হল কতবার। এক পয়সার মুড়ি, একটা সময় গেছে, যখন এইটুকুই ছিল তাঁর দুই ছেলে ধর্মদাস ও  জীমূতের সারাদিনের খাদ্য।
সুদীপ বসু 

                কিন্তু বড় শিল্পীর নিয়তি বোধহয় এইটিই। বিপন্নতা থেকে পেরিয়ে এসে আরো এক নতুন ও বড় বিপন্নতার ভেতর প্রবেশ করবার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা। ধীরে-ধীরে তাঁর এই নতুন ছবির সমঝদার জুটতে লাগল। ছবি বিক্রি হওয়াও শুরু হল এক-আধটা। আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার, যুদ্ধের সময় যেসব সৈন্যদের ক্যাম্প পড়ত কলকাতায়, তারাও যেচে এসে পয়সা খরচ করে তাঁর ছবি কিনে নিয়ে যেতে শুরু করল। যুদ্ধের লণ্ডভণ্ড অনুভূতির ভেতর তাঁর ছবি তাঁদের দু-দণ্ড স্বস্থি দিত হয়তো।

কলকাতা: জীমূতের তো শিল্পী হওয়ার ইচ্ছে ছিল------তবে কেন দোকানে বসে সময় নষ্ট করতে দিলে?
যামিনী: এখন ভাবি হয়তো ঠিক করিনি...আমার বড়ো ছেলে ধর্ম ওটা মেনে নিয়েছিল...জীমূত হয়তো মন থেকে মেনে নিতে পারেনি পুরোটা...মাঝে-মাঝে ওকে যেন কেমন বিষণ্ণ দেখতাম...তখন অবশ্য আমার ওসব লক্ষ করবার মতো সময় ছিল না বিশেষ...ছবির ভাষা নিয়ে ক্রাইসিসে ভুগছি তখন দিনরাত...ছবির বিক্রি নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। জীমূত একটু বেশি সেনসিটিভ ছিল...ওকে হয়তো আমার আরও অনেক নজর দেওয়া উচিত ছিল...”                                                                                                                          (যামিনী কলকাতা সাক্ষাৎকার: সঞ্জয় ঘোষ )

                একটা দিকচিহ্নহীন ধূ-ধূ বিজনপ্রান্তর। কয়েকটি শাল-পিয়াল ও বটের ঝুরি ছড়িয়ে আছে মাঠময়। একপাল শুয়োর সেই শুকনো পাতা চূর্ণ করে হেঁটে চলে যাচ্ছে। সেই অলৌকিক নির্জনতায় পাতাভাঙার যে মর্মরধ্বনি, তা যেন ছবি ফুটে বের হয়ে আসছে।
                জীমূতের আঁকা ছবি। জীমূত ছিল আর্টিস্ট। অসম্ভব শক্তিশালী আর্টিস্টতাঁর ধারণা যামিনী রায়ের ঘরানার প্রতিস্পর্ধী হয়ে উঠেছিল। হয়তো সেই কারণেই যামিনী চেয়েছিল জীমূত তাঁর সহকারী হয়ে থাকুক আজীবন, তল্পিবাহক হয়ে থাকুক। তাঁর ছবির প্রতি তাঁর ছিল চরম উদাসীনতা অথবা ভাষান্তরে অনীহা। পাড়ার মোড়ে দুই ছেলের জন্য মুদির দোকান করে দিয়েছিলেন যাতে তাঁরা নিজেদেরটা নিজেরাই বুঝে নিতে পারে। বড় ছেলে ধর্মদাস এটা সহজভাবে মেনে নিয়েছিলেন। টানাটানির সংসারে এটাই তো ভবিতব্য।
                  জীমূত পারেনি। জন্ম-আর্টিস্ট জীমূত। জন্মবিপ্লবী জীমূত। বড়দার মতোই বিপ্লবী দলে নাম লেখাল সে। কিন্তু ধর্মদাসের ব্যাপারটা জানতেন যামিনী রায়। বহুবার তাঁকে মানা করেছিলেন বিপ্লবীদলের সঙ্গে মিশতে, সন্ত্রাসবাদী বইপত্তর পড়তে। কিন্তু স্বল্পভাষী, অন্তর্মুখী জীমূত বিপ্লবীসঙ্গ করত গোপনে, বাবার সম্পূর্ণ অজান্তে। তাঁকে নিষেধের অবকাশ পাননি যামিনী।

কলকাতা: জীমূতের ঘটনাটা কী করে ঘটল?
যামিনী: তার দু-দিন আগে ও বলল, কলকাতায় আর ভাল্লাগছে না...আমি দু-দিন বেলিয়াতোড়ে ঘুরে আসি...না বললাম না...সঙ্গে ওর দুজন বন্ধুও গেল...
কলকাতা: হয়তো সেই সময় ওর চোখের দিকে তাকানোর তোমার সময় হয়নি রেখা ও রঙের সম্পর্ক নিয়ে তুমি তো খুব ব্যস্ত ছিলে তখন।
যামিনী:র চোখের দিকে কোনোদিনই আমি তেমন তাকাইনি বোধহয়...ও চলে যাবার ৫-দিন পরেই দুঃসংবাদটা পেলাম...ট্রাঙ্ককলে...আমার একজন খুড়তুতোভাই ফোন করল বেলিয়াতোড় থেকে                                                                                                                         ( যামিনী কলকাতা সাক্ষাৎকার: সঞ্জয় ঘোষ )

           আত্মহত্যা নয়জীমূত এর আগে একবার ( মতান্তরে দু-বার) আত্মহত্যা করতে গিয়েছিল। সে অন্য কথা। এবারকার ঘটনাটা সম্পূর্ণ অন্যরকম এবং অদ্ভুত। বাবার অনুমতি নিয়েই জীমূত বেলিয়াতোড় গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। মানসিক অবসাদ আর শহরের নিরবচ্ছিন্ন একঘেয়ে জীবনযাপন তাঁকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে এইটুকু জানা যায় যে, জীমূত যখন তাঁর দুই বন্ধুর সঙ্গে গভীর জঙ্গলে ঢোকে, সূর্য তখন প্রায় মধ্য-আকাশে। বিকেলের মুখে দুই বন্ধু জঙ্গল থেকে ফিরে এল। কিন্তু জীমূত এল না। বিকেল ফুরিয়ে এল। জঙ্গল আচ্ছন্ন হয়ে গেল প্রাগৈতিহাসিক অন্ধকারে।
              পরেরদিন আলোয় গ্রামের মানুষ হন্যে হয়ে খুঁজতে বেরোল জীমূতকে। অবশেষে জঙ্গলের ভেতর একটা ডোবার ধারে পাওয়া গেল জীমূতের স্তব্ধ মরশরীর। মুখ ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত। হাতে-পায়ে এমনকী গোটা গায়ে আঁচড়ানো-কামড়ানোর নৃশংস চিহ্ন।
              কে বা কারা মারল জীমূতকে? বন্যপশু না বুনো মানুষ? সন্তাসবাদী দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলই জঙ্গলের পথে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিত খুন নয়তো? তারপর বন্যজন্তুর নাগালে মৃতদেহ ফেলে পালিয়ে যাওয়া? নাকি নিছকই দুর্ঘটনা, ক্ষুধার্ত জানোয়ারের তাণ্ডব? ঐ দুই বন্ধুই-বা তাঁর খোঁজখবর না-করে ফিরে এল কেন? কেনবই-বা তারা অনুসন্ধানের কাজে বিশেষ একটা হাত লাগালেন না? সেই রহস্য আজও অস্পষ্ট থেকে গেছে। খবর পেলেন কিন্তু বেলিয়াতোড় গেলেন না যামিনী রায়। দু-দিন পর গ্রামের শ্মশানেই জীমূতের দাহকাজ হয়ে গেল।
             শুধু তুলি থেমে গেল তাঁর। ফাঁকা ক্যানভাসের সামনে বসে থাকতেন ঘন্টার-পর-ঘন্টা, দিনের-পর-দিন, রাতের-পর-রাত। আঁকার কোনো তাড়নাই ছিল না তাঁর। ধীরে-ধীরে গভীর অবসাদে ডুবে গেলেন যামিনী রায়। অবসাদে? না তীব্র মনোকষ্টে? অপরাধবোধে? না কি আতঙ্কে?
             শৈশবের সেই জঙ্গলের অবসেশন এতবছর পর মেজোছেলের মৃত্যুর কাঁধে ভর করে ফিরে এল নাকি?


শিল্পী: চন্দন মিশ্র 

।। বই উৎসব ।। কতবার ভেবেছি, পুনর্বার জেগে উঠি ।। পাঠক সেনগুপ্ত ।।

কবিতা আশ্রম-এর জুলাই সংখ্যা ২০১৮ (মুদ্রিত) থেকে: 

                           কতবার ভেবেছি, পুনর্বার জেগে উঠি

                        পাঠক সেনগুপ্ত


আমরা যারা বেড়েছি কাঁটালতা ঝোপঝাড় ছুঁয়ে কুঁড়েঘর, তাদের পিছলা আস্তিনভরা স্যাঁতসেঁতে কচুরিপানা, আর বানানো নদীর ঘোলাটে জলে ডুবে থাকতে-থাকতে খেয়াল করা হয়নি, কবে কীভাবে এই নগরীর একটি মেয়ের চোখের পরদায় নেমে এসেছিল ঘর, ব্যর্থঋতুর নানা স্বপ্নভঙ্গিমা আর পোড়াস্বপ্ন, পোড়ানদী পার হতে-হতে ‘ছায়ার ভিতরে মায়ামৃগের চোখে’ আমরাও কেউ বিষখালি, আবার কেউ-বা কীর্তনখোলা নদী হয়ে বেঁচে থাকলাম একটা আস্ত জীবন। ‘আমরা যারা অনন্তের পথে হাঁটছিলাম,’ বা অন্তত হাঁটছি বলে মনে করেছিলাম, সেই সুদূরের এক বন্ধু, শামীম রেজার কবিতা সংগ্রহ (চৈতন্য, সিলেট, বাংলাদেশ, টাকা ৩৩০) আসলে এক অনন্ত পথপরিক্রমার নদীকথা। এই গ্রন্থের পাতায়-পাতায়, শব্দে-শব্দে দুরন্ত এক মনখারাপিয়া বাঁশির কেবল নিজের সুরে কেঁদে-কেঁদে যাওয়া। ‘আসলে ধ্যানী নদী শুধু একা পৌঁছবে স্বপ্নসমূদ্রের মোহনমোহনায়...’ বলে শামীমের ‘পাথরচিত্রে নদীকথা’ শুনতে-শুনতে শুরু হল এই পরিক্রমণ। পথে যেতে-যেতে আমাদের কেবল আপন বৃক্ষসৌন্দর্য চেনা হল না, দীর্ঘপথ পার হয়ে গুহাচিত্রের নানা মানুষের সঙ্গে দেখা হল, কেবল জলমগ্ন হেমন্তের প্রলয় নিয়ে দাঁড়ানো রাত্তিরের কাছে কীভাবে কামাতুর লোভী বেড়াল চিৎকার করে, শোনা হল না আমাদের। ‘আপনি শুনলেন কীভাবে?’ শামীম? কী সহজে বললেন, এই লোভাতুর, কামজর্জর বেড়ালের পৃথিবীতে ‘বেঁচে আছি শূন্যতার বিষাক্ত খেলনায়...’ আর এই শ্রাবণমুষলবৃষ্টিদিন দেখে জীবনের সমস্ত জ্যোৎস্নাপাখি চলে যেতে-যেতে ফিরে আসবে, ভেবে দেখছি কেবল ‘ছিন্ন পালক পড়ে আছে চুপ’ আমাদের পুঁথিচিত্রকর হয়ে সেসব পড়ে-থাকা লিখে যাচ্ছেন শামীম, নিরন্তর...
             একবার দোলের মেলায় অচেনা সুরের নদী এসে ভর করলে আমরা আবার স্বপ্নের গন্ধে পাগল হয়ে উঠলামনিজেদের ভিতর ও অনুভূতির ভিতরে বসে থেকে পার করলাম কত যুগান্ত, কেবল সাধনা জানি না বলে দেখতে পাইনি তাকে... দেখতে পাইনি কেমন তাঁতিবউ শাড়ির পাট খুলছে আর সেই পাটে পাটে আমার অনন্ত বঙ্গদেশ পরিচিত মুখ নিয়ে আজও অমলিন থুরথুরে সন্ধ্যা হেঁটে যায়, আর নিজেকে হারিয়ে খুঁজি চেপে-ধরা এক নিঝুম-নিঃসঙ্গতায়‘আমরা কি রাত্রি-বিলাসী গাঙচিল?’ ভাবতে-ভাবতে স্মৃতির সুবর্ণনগরে রাত্তির নেমে আসছে। ‘রাত্তির নাইম্যা আসে মনের গভীরে আমার,’ আর শৈশবের শুকতারা কানে-কানে বলে যায়, ‘বলো তোমায়, কীভাবে স্বপন দেখাইএই রাত্তির জুড়ে হেতাল বনের আঁধার, শৃঙ্খলের শিকল-পরা শাপভ্রষ্টা দেবীকার মুখ, যুবতী মাংসের ঘ্রাণ গলে পড়ে, আর তারাদের স্নান সেরে উঠে-আসা এক রাত্তির অপেক্ষা লেখে আমাদের বসন্তদিনের খাতায়, নদী নিদ্রাহীন ঘুমায় আলোর আঁধারে


শামীম রেজা 


            শামিম লেখেন সেই ‘মর্গের দুয়ার থেইকা ফিইরা-আসা লাশ আমি গ্লোবাল এন্টিনায় নিজেরে শুকাই’ নিজেকে অতীত করে, আত্মঅভিমানের এত যে খেয়ালে মেতেছি আমরা, আমাদের কি মনে পড়ে না সেই দুঃখের স্বনির্মিত স্বরগ্রাম? বনপথ-মায়ার ভেতরে চলতে-চলতে কি হঠাৎ কোনও উদাস চোখের দিকে তাকালে মনে হয় না ‘তুমি দূরতম সঙ্গীত’? কেবল তোমার উদাসীমায়ার কাছে এসেও আমরা, নিজেদের এত্ত এত্ত বড় ভেবে-ভেবে ‘ছেনালী আশায় চোখ খুলতে বলি’ নির্জনতম নারীপ্রতিমাটিকেও বলতে কি ইচ্ছে করে না, ভাবতে কি ভালো লাগে না ‘বধূয়া আমার সান্ধ্যপাখির দলে, ধাঁধাময় পাহাড়ে থাকে, পথের বাঁশি হৃদয় মাঝে কাঁপে কোপাই নদীর বাঁকে...’? নিশ্চই মনে হয়, আর বিস্ময়ে সেই নিজের বিশ্বাস প্রকাশ না-করার শহুরে-অভিমানে আরশিনগরের দিকে যেতে-যেতে কোজাগরি রাত্তিরে খুঁজে ফিরি তাকে... সেই স্নিগ্ধনারীপ্রতিমা অথবা হারানো নদীটিকে 
               শামীমের মতো আমাদেরও ‘মেজাজটা খারাপ হয়া যায়, অমাবস্যা আইসা হাঁটু গাইড়া বয় পাশবারান্দায়,...’ তবু ব্রহ্মাণ্ডের স্কুল খুলে বসে কবি শুধু ব্যক্তিগত নরকে দগ্ধ হওয়া নীল অর্কিড নন‘কতবার ভেবেছি বৃক্ষজন্ম কিংবা পাখিজন্ম হতো যদি আমার/ তোমাদের জলে অবগাহন শেষে পুনঃ পুনঃ জন্ম দিতাম আবার’ সে-জন্ম নিশ্চই ব্রহ্মাণ্ডের স্কুলের, আর শামীম এক প্রদোষের জাদুকর, আমাদের দেখাচ্ছেন, ‘ওই দেখো জঙ্গল সমস্ত প্রাণীসহ চিৎ হয়া শুইয়া আছে আমার ডানায়, ঘুমপোকাদের ভিতর-বাহির কি এক অদ্ভুত পোড়াগন্ধ’...এই গন্ধ আমাদের অস্তিত্বের পুড়ে যাওয়ার? না-কি স্বপ্নের পুড়ে যাওয়ার? না-কি তাঁর সঙ্গে আমরাও বলতে পারব, ‘এতদিন পরে আমি জেনে গেছি সমস্ত জ্যোতির্ময় গোলক পাওয়া যাবে আমার আত্মার ভিতর আর এই জ্যোতির্ময় গোলকের ভিতরই আমার আবর্তন।’ আজ এই অদৃশ্য আততায়ী-সময়ে নিজেদের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে, ‘আমাদের চোখগুলো নিয়া যারা মার্বেল খেলেছে মধ্যদুপুরে পশ্চিমপাড়ায়, তাদের কথা এবার থাক, পাগল হবার পূর্বে সে চোখ বন্ধ কইরা হাঁটতো আর মধ্যরাতে একা লাল ঘোড়া তার বুক থেইকা বাইর কইরা তার পিঠে চইড়া মিলায়ে যেত দূর টিলার উদিত রেখায়,...’ আমাদের সেই দূর টিলার খোঁজে এখনও অনেক রাত্তিরপথ হাঁটা বাকি

      

         এই আপন মমির খোঁজে নেমে, নিজের অনেকানেক পাথরের সঙ্গে প্রত্যেক সাফল্যের সঙ্গে দেখা হতে-হতেও কী যেন বাকি রয়ে গেছে। বুকের গভীরে কোনও এক পলাতক পাখি ডেকেই চলেছে ভোর থেকে জোছনারাত্তিরময়নিজেকে গোপন রেখে আপন বাসনামতে এই যে নিজেকে গড়ে নেওয়া আমাদের ‘এই ভালো, সেই ভালো’ জীবন, আমাদের কেন মনে হল না, শামীম, কেন বলতে পারলাম না, ‘যে তুমি শিকারি, সেই তুমিই যে নিহত শিকার মনের গভীর ডালে বসেছে দুরন্ত এক পাখি। আমাদের এসমস্ত জীবনের সব গাছে আমাদের চোখের সামনে ফোটা ফুলেরা ক্রমে ফল হয়ে গেছে, ‘ফলের মধ্যে ঘুমন্ত বীজেরা আলোর খোঁজে’ যে আমাদের মুখ চেয়ে বসে আছে কোন অতীত থেকে, আর ফুলরেণু উদ্ভাসিত এই যে জীবনের প্রার্থণাগৃহ, এত মুখরের কাছে এসে দেখছি, ‘আমাকে মানুষ করবে দায়িত্ব নিয়েছিল যে নগর/ তার হৃদয় ছিল না কোনো;/ সে ছিল গুপ্ত নিশ্চিন্ত-ঘাতকের ঘর।’ আমরা সে-ঘর দেখেছি, সেখানে জীবিত শবেরা ঘাতক চোখে চেয়ে আছে আর আমরা কী ভীষণ চিৎকারে একটু শ্বাস নিতে-নিতে বলতে পারছি, ‘বেঁচে গেছি এমন পৃথিবীতে চোখ খুলিনি বলে চারিদিকে নির্ঘুম রাতের আবর্তন কত সায়র সময় পার হলে আমরা আপনার সমান মানুষ হব, শামীম?


শিল্পী:চন্দন মিশ্র 



                                                           দুই

‘পরবর্তী আলোচক শুরু করবেন এখান থেকে’কোথা থেকে শুরু করব, অনিকেত? আপনার ‘শব্দ-নৈঃশব্দ্যের অনুরণন’ আমাদের আলোকিত করে বসে থাকে। আমাদের এই ক্লেদাক্ত জীবন, এই মুখোশপরা মহাশয়-অস্তিত্ব, নিত্যদিন কথামালা তৈরি করে এগিয়ে যাওয়া, নাটকীয় ভঙ্গিতে ক্রমশ বিন্দু থেকে গড়িয়ে পড়ার কাছে এসে আপনার কাছেই শুনলাম, ‘একটা বৃত্ত আঁকার চেষ্টায় বারবার ব্যর্থ তুমি’ আমাদের এটা-সেটার জীবনে নিজেকে ঘিরে রচনা করা বৃত্ত কবে বড় হতে-হতে মহাবৃত্ত হয়ে উঠছি আমরাই, সে-খোঁজ যে রাখা হল না। বলা হল না মন খুলে, এই জীবনের ‘সবকিছুই প্রকাশ্য হোক, কেননা আড়াল আমাদের বঞ্চিত করে তাহলে কোথা থেকে আলোচনা শুরু করব আমরা? ‘এই বোধের অতীত তুমি কীভাবে পৌঁছুবে/ সমস্ত কোলাহল থেমে যায় এই উপান্তে’? কীভাবে ফেরাব নিজেদের সমূহ পতনসম্ভাবনা? ‘মাথার ভিতর অদৃশ্য দৃশ্যাবলির লিবিড সময়’ ছেয়ে আসছে। ‘সরীসৃপের মতো এঁকেবেঁকে চলে’ যাচ্ছে সময়। আর সেই স্বপ্নিল অন্ধকার নিয়ে ভেসে যাওয়া সময়ের অনর্গল প্রতিবেদনের ভাষ্য-ভরা অনিকেত শামীমের কবিতা (বাংলালিপি, ঢাকা, বাংলাদেশ, টাকা ৩০০) এইভাবেই শুরু হয়ে গেছে চলার কাহিনি লিখে।




             আমাদের আজীবনের অন্ধপাতায় জ্যোৎস্নাবিকিরণ দেখতে-দেখতে যে ঘটনা-কাহিনির কাছে এসে বসেছি, তার সংলাপভরা পাতায় পাতায় ‘শুধু দীর্ঘ প্রতীক্ষা ছিল, নিজেকে উন্মোচনের মৌনব্রত ছিল সান্ধ্যপ্রার্থণার মতো, প্রিয় নারীপ্রতিমার কানে কানে বলার ছিল, কেন আমার ভীষণ কষ্ট হয়। ‘অথচ হৃদয়ে আমার ব্যর্থতার কোনো গ্লানি নেই/ চিরকাল একা থাকার ভয় আমার মধ্যে নেই।’ আর, এমন একটা দিনের কথা ভাবুন, এমন সেই মুহূর্ত, ‘তখনো পৃথিবীতে আলো এসে পৌঁছোয়নি’, নিজেদের উন্মোচন ভেঙেচুরে খোঁজা শুরু হয়নি একটাও পথ। ধরুন, একদিন নিজেকে আপনি নিজের সামনে নানান সাজানো আয়নায় দেখতে-দেখতে হঠাৎ মনখারাপের সুরে বলে উঠলেন, ‘ও মন তুই কদ্দুর যাবি?’ সেইদিন অনিকেত যদি আপনাকে পালটা জিজ্ঞেস করে বসে, ‘কতদূর যেতে পারেন আপনি?’ তাহলে কী বলবেন, হে পাঠক? আমি তো বলব, ‘বেদনার ক্ষত বুকে নিয়ে কতদূর যাওয়া যায় বলো?’


অনিকেত শামীম 
            
            অনিকেতের ‘ছুঁয়ে দিই কিংবা স্পর্শের অতীত’ অনেক না-বলার মধ্যে জেগে উঠেছে মৌনপাথর হয়ে। তার কল্পনার আকাশে অন্ধকার ছুঁয়ে যায় অসংখ্য বাবুই। আর বুকের খুব কাছে নিবিড় হাত রেখে কবি বলে যান, ‘তোমার যত কষ্ট/ জমা দাও আমার হৃদয়ের কষ্টব্যাংকে। সুদে আসলে ফেরত দেবো সুখের কড়কড়ে চেক’ আহা, এই নীলকণ্ঠ আহ্বানের কাছে নত হতে যে কী সুখ, কী জ্যোৎস্নার মায়া! আনন্দ হয়। সহজ জীবনের আনন্দকিন্তু কবি আমাদের দুঃখদিনের বন্ধু। ‘তোমার আনন্দের(?) দিনে দূরে থাকা ভালো, কেননা অহেতুক চারপাশের পরিবেশ বিব্রতবোধ করবে’ বলে তিনি দূর থেকে এই জীবনকে দেখছেনএই জীবন, মানে ‘বেহালার তার ছিঁড়ে যাওয়া ভালোবাসা’। এই ‘জীবনের হিসেব মেলাতে গিয়ে একজন কেরামত আলি রক্তের ভেতর থেকে দীর্ঘশ্বাস টেনে আজীবন পালিয়ে যায়’ তবু, যাওয়া বললেই যাওয়া হয় না। দ্বিধাদ্বন্দ্ব, স্নায়ুযুদ্ধ বড় কঠিন তার কাছে এসে অনিকেত বারবার বলছেন, ‘অদ্ভুত আলোয় হেসে ওঠো’ বিশ্বাস করতে শেখো, একদিন হয়তো ঈশ্বরকে তাক লাগিয়ে ঘোষণা করতে হবে আমাদের মৃত্যুর পর কারও হস্তক্ষেপ থাকবে না। আর আমরা এই কবিতাজীবন সঙ্গে করে হাঁটতে-হাঁটতে পৌঁছে যাব সভ্যতার নতুন আবাসভূমিতে। সেই ভূমির বাগানে একটিই ফুল। ভালোবাসার। মানুষের। সেখানে দূরে-কাছে বলে কিছু নেই। নেই অন্ধ বালকের প্রতি ঈর্ষাও। জীবনের সবকটা দরজা খুলে সেখানে বলতে হবে না, ‘আমাকে আমি চিনতে পারিনি আজও’ ভাবুন, এরকম একটা বিশ্বাসের কাছে আমরা এসে গেছি সবাই। আর সেই অস্তিত্বের কাছেই আছেন অনিকেতবলতে পারছেন, ‘এই তো বাড়িয়েছি হাত/ সমস্ত ভয়, দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছেড়ে বাড়ালাম হাত’
             আমরাও হাত বাড়িয়েই রইলাম।  


শিল্পী:চন্দন মিশ্র 


।। কবিতা আশ্রম ব্লগজিন ।। তৃতীয় সংখ্যা ।। ডিসেম্বর ২০১৮ ।।

শিল্পী: চন্দন মিশ্র                                                           কথা    ফের নকশিকাঁথার ভাঁজ খুলে মাঠে-মাঠে অঘ...